‘পুঁজিবাদ নারীকে সর্বপ্রকার স্বাধীনতা দিয়েছে বলে
আস্ফালন করে, অথচ ব্যাপার একই, উভয় ক্ষেত্রে। মেয়েদেরকে জড়পিন্ড বলে গন্য করা হয়
সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায়, দামী ও সচল পুতুল বলে গন্য করা হয় পুঁজিবাদী ব্যবস্থায়।
ঐটুকুই তফাৎ। কিন্তু উভয় ব্যবস্থাই অমানবিক, জড়পিন্ড যেমন মানুষ নয়, সচল পুতুলও
তেমনি মানুষ নয়। নারী মুক্তি এদেশে ঘটেনি, নারীর অবস্থানের পরিবর্তন হয়েছে,
গৃহাভ্যন্তর থেকে তাঁকে কোথাও কোথাও এনে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে প্রদর্শনীর
প্রাঙ্গনে’।
উপরিক্ত কথাগুলো আমার প্রিয় একজন শিক্ষক (সরাসরি অর্থে নয়) যার লেখা আমাকে
নতুন ভাবে, নতুন করে চিন্তা করতে অনুপ্রাণিত করেছে। যখনই তার কোন লেখা পড়েছি, নতুন
কিছু শিখেছি, নতুন একটি জানালা আমার সামনে খুলেছে। প্রগতিশীলতার যা কিছু আমার কাছে
সে উনার কাছ থেকেই শেখা। বিশেষ করে তার লেখার স্টাইল আমি না চাইলেও চলে আসে আমি
যখন কোন কিছু লিখি। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক ডঃ সিরাজুল
ইসলাম চৌধুরী।
কিন্তু সে তাকেই যখন সেদিন ‘নাগরিক সমাজের’ ব্যানারে উপস্থিত হয়ে বর্তমান
হেফাজতে ইসলামের ১৩ দফার বিশেষ কয়েকটি দফা নিয়ে সমালচনা করতে শুনি, খুভ খারাপ লাগল
তখন। আপনিও কি করে পারলেন চলমান স্রোতে গা ভাসিয়ে দিতে? তাই সন্দেহ আসে এই তিনিই
কি তার অন্য একটি লেখায় উপরের কথা গুলো লিখেছিলেন নারীর বর্তমান অবস্থানের উপর?
বর্তমান সময়ে হট টপিক হচ্ছে হেফাজতে
ইসলামের ১৩ দফা। দাবী মানা হবে কিনা সেটা ভিন্ন কিন্তু সেই দফাগুলোর পোস্টমর্টেম
করা হচ্ছে প্রতিদিন। সেগুলো দেখে নিজে কিছু লেখার আর প্রয়োজন মনে করিনি। কিন্তু
এখন যাদের কাছ থেকে হেফাজতের দফা গুলোর ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ পড়ছি তাতে মাথা হট হয়ে
যায়।
আজকে যারা ভিবিন্ন ব্যানারে
প্রগতিশীলতার ধোঁয়া তুলছেন, মৌলবাদ এর কথা বলছেন, এগুলো কিন্তু নতুন কিছু না। আপনি
আমি যদি একটু গভীরভাবে লক্ষ্য করি তবে দেখব এখন যারা মৌলবাদ নিয়ে, ইসলাম ফোবিয়া
নিয়ে কথা বলছেন তারা সে অনেক আগে থেকেই বলেছেন। আমার মনে আছে ৯৬ এর পর আওয়ামীলীগ
সরকার ক্ষমতায় আসার পর তাদের এই মৌলবাদ ফোবিয়া’র পারদ উপরের দিকে উঠা শুরু।
পত্রিকার প্রতিদিনের কলামে, প্রবন্ধে-নিবিন্ধে ঐ একই সুর, মৌলবাদে দেশ ভরে গেছে।
বাংলাদেশ আফগানিস্থান হতে আর বেশি দিন বাকী নেই। কিন্তু আমরা কি দেখলাম দেশতো
আফগানিস্তান হইনি, বরং ২০০১ বি এন পি জামাতের সরকার।
সেই প্রথম থেকেই তাই আমার মনে হচ্ছে
এদের, এইসব বুদ্ধিজীবীর আসলেই অন্য কোন দায় নেই। তাই এ নিয়েই পড়ে থাকেন দিন রাত।
মৌলবাদ, জঙ্গীবাদ এইসব নিয়ে। জানিনা এতে তাদের কি লাভ, কিন্তু তাদের যে মেধা আর
সম্মান, সেটা যে দিন দিন ক্ষয়ের দিকে সেটা বুঝতে বাকি থাকেনা। আর সেই দিনের নাগরিক
সমাজের ব্যানারে তাদের চেহারা দেখে আরো বেশি নিশ্চিত হলাম। হেফাজত কি এমন দফা দিল
যে সেটা নিয়ে আমাদের বাঘা বাঘা বুদ্ধিজীবিদের নিদ হারাম হয়ে গেল। নাকি, ঐ অসুখটাই
আসল, তাদের বক্তৃতা আর প্রগতিশীলতা দেখানোর, বাহাদুরি দেখানোর মোক্ষম বিষয় সামনে
এসেছে, চুপ থাকেন কি করে।
সবাই জানেন, হেফাজতে ইসলামের দফা নিয়ে
প্রথম প্রথম কেউ তেমন রা করেন নি। কিন্তু যখন সেটি একটি গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে চলে গেল
এবং সেটা নিজেদের অস্তিত্বের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াল, তখনই শুরু হল অপপ্রচার।
অপপ্রচাইতো বলব। আমি খুব ভালো করেই জানি তারা হেফাজতে ইসলামের দফা গুলো ভালো করেই
বুঝেছেন। এক এক জন ডক্টরেট, তদেরকে যদি ‘অবাধ মেলামেশা’ ‘বেহায়াপনা’ ‘অবাধ বিচরন’ টাইপের
শব্দ কে ব্যখ্যা বিশ্লেষণ করে বুজাতে হয়, তবে এর চেয়ে লজ্জাজনক ব্যাপার আর কি হতে
পারে।
হ্যাঁ, যতদুর দেখা যাচ্ছে আমাদের
বুদ্ধিজীবীদের বর্তমান মাথা ব্যাথা হেফাজতের এই দফা নিয়ে
‘ব্যক্তি ও
বাকস্বাধীনতার নামে সব বেহায়াপনা, অনাচার, ব্যভিচার, প্রকাশ্যে নারী-পুরুষের অবাধ বিচরণ,
মোমবাতি প্রজ্বলনসহ সব বিজাতীয় সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ বন্ধ করতে
হবে’।
আরেকটা দফা হয়ত তাদের কিছুটা বিরক্ত করেছে সেটা হচ্ছেঃ
মসজিদের
নগরী ঢাকাকে মূর্তির নগরীতে রূপান্তর এবং দেশব্যাপী রাস্তার মোড়ে ও
কলেজ-ভার্সিটিতে ভাস্কর্যের নামে মূর্তি স্থাপন বন্ধ করতে হবে।
এখন কথা হচ্ছে আসলেই কি তারা এই সব শব্দের ভুল অর্থ করেছেন নাকি ইচ্ছা করেই
ভুল অর্থ দাড় করাচ্ছেন? আমি তাতে এমন কিছু পাইনি যাতে তাদের মত মনে হবে এই দফায়
দেশ ১৩০০ বছর পিছনে চলে যাবে। কেউ কেউ বলছেন মধ্যযুগে দেশ চলে যাবে।
সত্যি কথা বলতে কি এইরকম কথা বার্তা আমরা কিছু কিছু সুবিধাবাদী ব্যাক্তি ও লম্পট রাজনীতিবিদদের
কাছে থেকে শুনে অব্যস্থ। তাই আমাদের জাতীয় পর্যায়ের ডক্টরেট গনদের কাছ থেকে এই রকম
বাক্য শুনে আমি কেন যে কোন স্বাভাবিক চিন্তার মানুষ ‘টাসকি’ খাবে। হেফাজতের
দফাগুলো নিয়ে একজন মুসলিম হিসেবে আমার কোন আপত্তি নেই বিশেষ করে যে দফাগুলোতে
আমাদের সুশীলগণ মধ্যযুগের চুলকানি অনুভব করেন। তাই কে কি বললেন তাতে আমার মাথা
ব্যাথাও নাই। তবে সঙ্কা যে নেই তা কিন্তু না। যাই ঘটুক এই চাপ্পান্নহাজার
বর্গমাইলের বাংলাদেশেই ঘটবে, সুতরাং ভুক্তভোগী সে আমরাই হব।
কিন্তু আমার চিন্তা অন্য বিষয়ে। কেন আমাদের বিশিষ্ট নাগরিক সমাজ অধিপতিদের
কাছে হেফাজতের দফাগুলোকে মধ্যযুগীয় মনে হবে, কেন মনে হবে বাংলাদেশ আফগানিস্তান হয়ে
যাবে? দেশ পিছিয়ে যাবে ১৪০০ বছর পিছনে? যেহেতু তারা চিন্তাশীল মানুষ তাদের
চিন্তারোতো একটা দাম আছে। তাই সেটা মেনে নিয়ে আরো দু একটি কথা বলতে চাই।
তাঁদের বক্তৃতা আর আবেগী গলার বক্তব্য থেকে এ কথা মোটামুটি পরিষ্কার বাংলাদেশের
এখন একমাত্র সমস্যা হচ্ছে হেফাজতে ইসলামের ১৩ দফা। কেটে চেটে সেটা আসলে ইসলাম
কিংবা ইসলামিক মৌলবাদ। (কারন তাঁদের কাছে ইসলামের মৌলিক বিষয়গুলো আগে যেমন এখনও
তেমন, মৌলবাদ হিসেবেই পরিচিত। আমার মনে আছে যখন ইসলাম প্রিয় জনগনের সংবদ্ধতাকে
উনারা মৌলবাদের সাথে তুলনা করতেন তখন প্রথম দিকে খারাপ লাগত। পরে যখন আমরা স্বীকার
করলাম এবং দ্বের্থহীন ভাষায় বললাম হ্যাঁ, আমরা মৌলবাদী, ইসলামের মৌলিখ বিষয়ের সাথে
আমরা কোন আপোষ করিনা, তখনই তারা চুপসে গেলেন, মৌলবাদ শব্দ আজকাল আর এত বেশি শুনা যায়
না, যেমন শুনা যেত ১৯৯৪-২০০০ সালের দিকে ।) সুতরাং তাঁদের কথা মেনে নিলে সেটা
দাড়ায় সেটা হচ্ছে-এদেশে ইসলাম ও ইসলামিক ভাবধারার জনগন ই মুল সমস্যা। এর বাহিরে আর
কোন সমস্যা নাই, অন্তঃত বিরাট সেমিনার করে সেটা ফলাও করে নিজেদের সুশীলতা প্রচার
করার মত। কিন্তু আমার কুঠিল মন তাঁদের এই সরলতার মধ্যে ছিদ্র দেখতে পায়। তাই আমার
প্রশ্ন- বাংলাদেশে যখন দুর্নীতির বন্যায় ভেসে যায় তখন দেশ পিছিয়ে যায় না। প্রতিবছর
বন্যার বাধ ভেঙে হাজার হাজার পরিবারের উদ্ধাস্তু হয়ে মানবেতর জীবন যাপনে বাধ্য হয়,
তাতেও দেশ পিছায় না। সন্ত্রাসী, চাদাবাজ, ঋণ খেলাফি, ঘোষখোর চাকরিজীবী আর
সন্ত্রাসের গডফাদাররা সংসদ সদস্য হয়ে আমাদের ভাগ্য নিয়ন্তা হয়ে বসে, তাতেও আমার
দেশে কিছু যায় আসে না। লঞ্চ ডুবিয়ে মানুষ হত্যায়ও কোন বর্বরতা হয় না। বহুতল আর গার্মেন্টস এ গেইট লাগিয়ে জীবন্ত মানুষ দগ্ধ
করাতে মধ্যযুগীয় বর্বরতা হয় না। প্রতিদিনের খুন, গুম আর বিপরীত মতের লোকদেরকে
অত্যাচারে দেশের ভাবমুর্তি প্রতিদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে নিশ্চয়ই। এতেও দেশ এগিয়ে
যাচ্ছে। ভাবতে ভালোই লাগে। চারিত্রিকভাবে দুর্বল অতি কথকরা যখন আমাদের সাধারনের
সুখ দুঃখ নিয়ে উপহাস করেন তাতেও আপনাদের কিছু যায় আসে না। আপনারা সুবিধাভূগী উচ্চ
মধ্যবিত্তরা সেই সব হাহাকার শুনেন না। তাই আজ হেফাজতের ১৩ দফাই আপনাদের চোখে ভয়ংকর
হয়ে দেখা দিয়েছে। হেফাজতকে না থামালে দেশের স্বাধীনতা থাকবে না! সত্যিই করে
বলুনতো, বুকে হাত দিয়ে, চার পাশ দেখে বলুনতো – এই চলমান বাংলাদেশে এই অরাজকতায়, এই
দুর্বিসহ জীবনে হেফাজতের কি আদৌ কোন দায় আছে?
না, আর কিছু বলার নেই। সেদিনের নাগরিক সমাজের সেমিনারে আপনারা যদি এই
কোথাগুলোও বলতেন দীপ্ত কন্ঠে, তবে বুজতাম দেশের প্রতি আপনাদের এ দরদ খাটি। কিন্তু
পারছি না। আর আপনারাও পারেন না সকল জায়গায় সব কিছু বলতে। তা না হলে যে যারা
আপনাদের সম্মানিত করে, পুরস্কার দেয়, টেলিভিশনে আপনাদের থক থকে চেহারা ভিবিন্ন
এঙ্গেল থেকে দেখায় সেটা যে আর হবে না। সামাজিকভাবে আপনারা হয়ে যাবেন বন্ধ্যা। আমার
ইদানীং কেন জানি মনে হয়, আপনারা আসলেই বন্ধ্যা, কেবল আপানদের প্রতিভাগুনে আমরা
সেটা বুজতে পারি না, আমাদেরকে বুজতেও দেন না।
এর চেয়ে বেশি কিছু বলা আমার শোভা পায় না। আপনারা উচ্চ শিক্ষিত, আপনাদের
প্রতিভা আমার দেশের সুনাম উচ্চ করে। তাই আপনাদের কিছু বলার দুঃসাহস আমি দেখাই না।
শুধু আপনাদের মতই উচ্চ শিক্ষিত, প্রগতিশীল মানুষের উক্তি দিয়ে শেষ করছি –
‘আধুনিক প্রচার মাধ্যমগুলো অসংখ্য শুয়োরবৎসকে মহা মানব রুপে
প্রতিষ্ঠিত করেছে’। ( ডঃ হুমায়ূন
আজাদ)
( এই লিখা ‘সাভার ট্রাজেডি’ শুরুর দুদিন আগে
লিখা, তাই উপরে উল্লেখ করা হয় নি। এই সাভার ট্রাজেদিকেও নিশ্চয়ই মধ্যযুগীয়
বর্বরতায় ফেলা যায় না? হেফাজতে ইসলামের দফা গুলো সরকার মানুক কিংবা না মানুক একদিক
থেকে ভালোই হল যে আমাদের কিছু বর্নচোরা বুদ্ধীজীবিদের আসল চেহারা চেনা গেল, যারা
ধর্ম হিসেবে ইসলামকে শিখেলে ভাবেন, ১৩০০ বছরের পুরনো নিয়ম কানুন হিসেবে মানেন ও দেখেন
এবং মনে করেন এই স্মার্ট ফোনের যুগে ইসলাম অচল। আর এটা যদি উনারা ধর্মীয় বিশ্বাস
নিয়ে বলেন ইসলামিক পরিভাষায় এর পরও তারা মুসলমান কিনা সেটা একটি বিরাট ভাবানার
বিষয়, যদিও মুখে তারা স্বীকার করতে চান না।)